সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে ফের বিতর্ক

প্রকাশিত: ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদন:

টানা পাঁচ বছর সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোনো কোটা ছিল না। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত চাকরিতে সব নিয়োগ এভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ৫ জুন এক রিট মামলার নিষ্পত্তি করে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ অন্য কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকার যে পরিপত্র জারি করেছিল, তা বাতিল করে দেন হাইকোর্ট। এই আদেশের ফলে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে (জাতীয় বেতন গ্রেড ৯ম থেকে ১৩তম) ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল হয়েছে। এ কারণে আবারও আলোচনায় এসেছে চাকরিতে কোটা প্রথা।

২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। মেধার চেয়ে কোটার নিয়োগ বেশি হয়ে যাওয়ায় এ নিয়ে ছিল বিতর্ক। তবে ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কোটাবিরোধী আন্দোলন হয়। এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভা ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই সরকার জানায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে (৯ম থেকে ১৩তম) নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনো কোটা বহাল নেই, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে (১৪তম থেকে ২০তম পর্যন্ত) কোটা বহাল রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ প্রার্থীর মেধা তালিকা থেকে তা পূরণ করতে হবে। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি কোটার বিষয়ে আগের জারি করা পরিপত্র স্পষ্ট করার পাশাপাশি মন্ত্রিসভার বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সরকারি চাকরিতে অষ্টম বা তার ওপরের পদেও সরাসরি নিয়োগে কোটা বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পক্ষে অহিদুল ইসলাম তুষার উচ্চ আদালতে ২০২১ সালে রিট মামলা করেন। এ মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াত সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৫ জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য কোটা বাতিল করে জারি করা ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন। এই রায়ের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা হয়। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়। পরে এ রায় স্থগিত চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে হাইকোর্টের রায় আপাতত বহাল রেখেছেন চেম্বার আদালত। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য আগামী ৪ জুলাই দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এ আদেশ দেন। ফলে সবাই শুনানির অপেক্ষায় রয়েছেন।

এদিকে, সরকারি চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩ম গ্রেডে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের রায় প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আগামীকাল রোববারের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুরোপুরি বাতিল করা না হলে দেশব্যাপী আন্দোলনের আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা।

যেভাবে চাকরিতে কোটা শুরু
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিতে প্রথম কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সময়ে এই কোটার পরিধি বেড়েছে, নতুন নতুন কোটা যুক্ত করা হয়েছে। ৬৪ জেলার জন্য এখনও কোটা রয়েছে।

সদ্য স্বাধীন দেশে বৈষম্য কমাতে মূলত অনগ্রসর মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই সেই সময়ে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
কোটায় সবচেয়ে বেশি পদ মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য, ৩০ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য এই কোটার পদ সংরক্ষিত। এর বাইরে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ আসন থাকত।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে ২৫৮ ধরনের কোটা ছিল। প্রথম শ্রেণির চাকরিতে মোট পাঁচ ক্যাটেগরিতে কোটার ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদ ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটায়।

কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদেরও অতীতে কখনও কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিলের দাবি তুলতে দেখা যায়নি। ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে ২০১৮ সালে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল, সেগুলোর অন্যতম ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটার সংস্কার। আন্দোলনকারীরা চেয়েছিলেন, সেই সময়ের ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ, সেটিকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক।

তাদের সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। তবে কোটা ব্যবস্থা বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনের কয়েকটি সংগঠন। মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল তারা। পরে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা ২০২১ সালে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। যে মামলার রায় নিয়ে বিষয়টি এখন আবার সামনে এলো।

কোটাবিরোধী চাকরিপ্রার্থীদের ভাষ্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভোগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, সরকারি চাকরিতে আমরা কোনো ধরনের কোটা চাই না, সম্পূর্ণ বাতিল চাই। ৩০ জুনের মধ্যে আমাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটা আছে। তবে এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে ১৪ম গ্রেড থেকে ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল রয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এটিও অযৌক্তিক– এটি বৈষম্য তৈরি করছে। কারণ, মেধার থেকেও এখানে কোটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তাই কোটা পুনর্বিবেচনা করে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হোক, এটাই শিক্ষার্থীদের দাবি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও নাগরিক ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, আমরা কোটা চাই না। ২০১৮ সালে ঢাবি, রাবি, চবিসহ সারাদেশে কোটার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, যদি সোনার বাংলা গড়তে হয়, তাহলে কোটা প্রথা বিলুপ্ত করা হবে। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল হাইকোর্টে রিট করে আবারও কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

কোটার পক্ষের চাকরিপ্রার্থীরা যা বলছেন
মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালে রিটকারী এবং ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম’ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি অহিদুল ইসলাম তুষার বলেন, যারা কোটার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে আসেন, তারা কম মেধাবী– এই অপপ্রচার ও গুজব সর্বদাই ছড়ানো হয়। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, একই যোগ্যতা নিয়ে আবেদনকারী, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সবাই মেধাবী। উত্তীর্ণদের মধ্যেই কোটা বণ্টন করা হয়। একই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একই সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া কাউকে মেধাবী আর কাউকে মেধাবিহীন বলার মানে কী?
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোনো প্রাপ্তি দেখলে কিছু মানুষের গা জ্বলে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ উপহার দিয়েছেন, টানা ২১ বছর এক সময় তারা রাষ্ট্র থেকে তেমন কিছুই পাননি। ৩০ শতাংশ কোটা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের জন্য সম্পূর্ণ যৌক্তিক। তবে তিনি এটাও বলেন, এটা সত্য, কোনো কোটাই অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না।

‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম তোফায়েল আহমেদ বলেন, কোটা ব্যবস্থা সরকারের নির্বাহী বিভাগের বিষয় হলেও সুপ্রিম কোর্ট যখন সমর্থন করে, তখন তা আর নির্বাহী বিভাগের বিষয় থাকে না। তাই এটি বাতিল করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের পুনর্বাসন বা প্রতিষ্ঠিতকরণের জন্য কোটা দেওয়া হয়, যা সংবিধানের ২৮(৪), ২৯(৩) অনুচ্ছেদ সমর্থন করায় কোটা বাতিল করার সুযোগ নেই।

মুক্তিযোদ্ধা সন্তান হাসান আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় থাকার পরও কোটা বাতিল করলে তা হবে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান গৃহীত ও কার্যকর হওয়ার আগে কোটা প্রবর্তন হওয়ায় সংবিধানের ১৫০(৩) অনুচ্ছেদ সমর্থন করে, তাই বাতিল করা যায় না।

মুক্তিযোদ্ধা সন্তান গোলাম কিবরিয়া বলেন, কোটা বাতিলের পর আমি মোট ১৯টি ভাইভা দিয়েছি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান শুনলে চাকরিতে নিতে চায় না।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা কী বলেন
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, কোটা থাকতে হয়, দরকারও আছে। সংবিধানেও এর সুযোগ আছে। তবে কোটা হবে অনগ্রসরদের জন্য, যেন তারা আরও পিছিয়ে না পড়ে। আর সেটা হবে খুবই অল্প। অথচ আমাদের এখানে মেধার চেয়ে কোটা বেশি হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোটা ১০ শতাংশের বেশ হওয়া উচিত নয়।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোটার বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।

সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, কোটা নিয়ে আমি বিশদ গবেষণা করেছি। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে আছে। আমি নিজেও মুক্তিযোদ্ধা। আমার গবেষণা ও দীর্ঘ চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অভিমত হলো, এখনকার বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ছাড়া আর কোনো কোটাই থাকা উচিত নয়। সরকারি চাকরি ৯৫ ভাগই মেধাভিত্তিক হওয়া দরকার। কোটা তুলে দিলে সরকারি চাকরিতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্যও দূর হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।