শহীদ পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে মালামাল লুটের ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ

প্রকাশিত: ৩:২১ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২৪

যশোর প্রতিনিধি:

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কর্তৃক শহীদ পরিবারের সন্তানের বসতঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে নগদসহ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাটের ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ। আজ শনিবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফেরার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ক্ষতিগ্রস্ত আসাদুজ্জামানের বড় ছেলে আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের বেয়াই নুরুল ইসলাম শিল্প ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণ পরিশোধ না করায় ২.৯৭ একর জমি নিলাম করে ব্যাংক। সেই জমি কিনেছিলাম আমরা। পরবর্তী সময়ে ওই জমি দখলে নিতে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছিল। সর্বশেষ দখল নিতে ২৭ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন দুই শতাধিক সন্ত্রাসী, স্ক্যাভেটর, ভেকু মেশিন, ট্রলি নিয়ে হামলা চালান। ওই সময় তারা বাড়ির সবাইকে জিম্মি করে পুরো বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ঘরে রক্ষিত জমি কেনার নগদ ১০ লাখ টাকা, ৩০ ভরি সোনার গহনা, তিনটি গরু, ছয়টি ছাগল, প্রায় ৬০ টন ধান ও গমসহ কোটি টাকার মালামাল সাত-আটটি ট্রাক্টরের ট্রলিতে করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওইদিনই থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে যশোর কোতয়ালি থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘হামিদপুরের ঘটনায় কেউই আমার সঙ্গে মামলার বিষয়ে কথা বলেননি। কাগজপত্রসহ থানায় এলে অবশ্যই মামলা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা তাদের নিলামে কেনা সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে এবং জুলুম-নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সভাপতির সন্ত্রাসী বাহিনীর কারণে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফেরার বিষয়েও শঙ্কা প্রকাশ এবং আগামীকাল (রবিবার) সকালে শহরের মুজিব সড়কে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে এবং দোষীদের আটকের দাবিতে তারা মানববন্ধন করবেন বলে জানান।

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত আসাদুজ্জামানসহ তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ জুন দুপুরে সদরের হামিদপুর পশ্চিমপাড়ায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শহীদ উদ্দিন আহমেদের ছেলে মো. আসাদুজ্জামানের বাড়িঘর ভেকু মেশিন দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। দেড় শতাধিক লোকজন হামলা চালিয়ে ওই বাড়িতে লুটপাট চালায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন তার বেয়াই নুরুল ইসলামের পক্ষে ওই বাড়ির জমি দখলের জন্য এই হামলা ও লুটপাট চালান। হামলার সময় ঘরে থাকা নগদ টাকা, সোনার গয়না, গরু-ছাগল, ধান-গমসহ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় তারা। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে এ তাণ্ডব চালানো হয়েছে।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সেদিন শহিদুল ইসলাম কোনও বক্তব্য না দিলেও পরদিন ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যশোর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ওই ঘটনায় আমার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। জমি নিয়ে আমার বেয়াই নুরুল ইসলামের সঙ্গে আসাদুজ্জামানের ঝামেলা রয়েছে।’

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ ২০-৩০ জন সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। পরে আরও শতাধিক লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নেয়। আসাদুজ্জামানের ছেলে এবিএম জাফরি ও আফরাউজ্জামান বাড়িতে ছিলেন। অস্ত্রের মুখে বাড়ির লোকজনকে জিম্মি করে তাদের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।

এবিএম জাফরি বলেন, ‘দুপুরে বাড়িতে কাজ করছিলাম। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলামের দেড় শতাধিক লোক শটগান, হকিস্টিক, লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। ১৫-১৬টি মাইক্রোবাস, সাত-আটটি ট্রাক্টর-ট্রলি, দুটি জিপ গাড়ি, প্রাইভেটকার ও বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে এসেছিল তারা। হামলার পর বাড়িটি ভেকু মেশিন দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। ঘণ্টাখানেকের তাণ্ডবে আটটি বসতঘর, দুটি রান্নাঘর, তিনটি ফলদ গাছ ধ্বংস করা হয়। জমি কেনার জন্য ঘরে রাখা ১০ লাখ টাকা; মা, ভাবি ও স্ত্রীর ৩০ ভরি সোনার গয়না; তিনটি গরু; ছয়টি ছাগল; ৬০ মেট্রিক টন ধান-গমসহ কোটি টাকার জিনিসপত্র সাত-আটটি ট্রাক্টর-ট্রলিতে করে নিয়ে যায় তারা।’

বাড়ির মালিক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা শহীদ পরিবারের সন্তান। আমার বাবা শহীদ উদ্দিন আহমেদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। শহিদুল ইসলাম মিলন আমার বাল্যবন্ধু। সম্প্রতি আমাদের বাড়ির জায়গার সাবেক মালিক নুরুল ইসলাম শহিদুল ইসলাম মিলনের বেয়াই হয়েছেন। নুরুল ইসলাম এই জায়গা ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। ১৯৯২ সালে ব্যাংক জমিটি নিলামে তুললে আমরা কিনি। পরে সেখানে বাড়ি করে বসবাস করে আসছি। গত বছর মিলন বাড়ির জমি দখলের জন্য তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন। ওই সময় তাদের হামলায় আমার সন্তানরা আহত হন। তখন গ্রামবাসীর প্রতিরোধে সন্ত্রাসীসহ তিনি পালিয়ে যান। এ বিষয়ে আমরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম। এখন আমাদের ওপর আবারও হামলা ও বাড়িঘরের জিনিসপত্র লুটপাট করেছে।’

এদিকে, গত ৯ জুন শহরের দড়াটানা সংলগ্ন কসবা পুলিশ ফাঁড়িতে যশোর নারী, শিশু ও মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান মুকুলকে মারধর করেন শহিদুল ইসলাম। এ ঘটনায় ১১ জুন দুপুরে যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগী মোস্তাফিজুর। বিচারক গোলাম কিবরিয়া মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় শহিদুল ইসলামসহ দুজনকে আসামি করা হয়। মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে জেলা আইনজীবী সমিতি মানববন্ধন করে। ওই মানববন্ধন থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অভিযুক্ত শহিদুল ইসলামের শাস্তির দাবি জানানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।