দুর্নীতি দমনে কথা বেশি, কাজ কম

প্রকাশিত: ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদন:

অভিযোগের পর অভিযোগ জমলেও হেলদোল নেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। দিনের পর দিন অনুসন্ধানই চলে। নেওয়া হয় না দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ; দেওয়া হয় না অভিযোগপত্র। কোনো কারণে কেউ আলোচনায় এলেই কেবল নড়েচড়ে বসে দুদক। বাকি সময়ে মুখ দেখে করা হয় দুর্নীতির অনুসন্ধান। ফলে অভিযুক্তরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সূত্রের দাবি, বর্তমানে দুদকের অনুসন্ধানে রয়েছে ২ হাজার ২১৫টি ফাইল। তাদের মধ্যে অর্ধশত আমলা, সাবেক ও বর্তমান মিলে অন্তত ২০ পুলিশ কর্মকর্তার ফাইল দীর্ঘদিন ধরে আটকা রয়েছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা বলছেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় কথাবার্তা বা কাগজকলমেই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে দুদক কিংবা সরকার শক্ত অবস্থান না নেওয়ায় বেড়েই চলেছে দুর্নীতি।

সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য সামনে আসার পর দুদকও নড়েচড়ে বসেছে। তবে তাদের অনুসন্ধানে থাকা রাঘববোয়ালদের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে কচ্ছপগতিতে।

আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনেই শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের সাঁড়াশি অভিযান ছিল চোখে পড়ার মতো। কমিশনের ইতিহাসে বাকি সিংহভাগ সময়ই প্রভাবশালী আমলা, পুলিশ কিংবা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দেখা গেছে দায়সারা। চুনোপুঁটিদের নিয়ে হম্বিতম্বি করে পার করেছে সময়। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। অবাধে অর্থ পাচার হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি খাতের সম্পদ দুই হাতে লুটপাট, প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলসহ সর্বত্র দুর্নীতির মচ্ছব হলেও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে আছে দুদক।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থীদের হলফনামায় কারও কারও ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ সম্পদ বৃদ্ধির খবর ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও, কমিশনের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। দুদক চেয়ারম্যান হলফনামার সম্পদের ওইসব তথ্য খতিয়ে দেখবেন প্রতিশ্রুতি দিলেও, এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি।

দুদকের জালে অর্ধশত আমলা

যেসব আমলার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে, তারা হলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব কবীর বিন আনোয়ার, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি হারুন অর রশীদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শারফুদ্দিন আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ফারজানা ইসলাম, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক স ম গোলাম কিবরিয়া, বিআইডব্লিউটিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সারাফত, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক সালাহ উদ্দীন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক শাহনাজ পারভীন, ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. শফিউদ্দিন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একিউএম ইকরামুল্লাহ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুর রউফ, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম, গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান প্রধান, ঢাকাস্থ শেরেবাংলা নগরের ৩ নম্বর সার্কেলের উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নওশাদুল হক, উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আতাউর রহমান ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে দুদক।

পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা) আইয়ুব খান চৌধুরী, তিতাসের সাবেক পরিচালক খান মইনুল মোস্তাক, সিনিয়র সুপারভাইজার হারুণ আল রশিদ, সিনিয়র বিক্রয় সহকারী ফয়েজ আহমেদ লিটন, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এমডি প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম, তিতাসের গাজীপুর অঞ্চলের ডিজিএম রফিকুল আলম, উপসহকারী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হোসেন ও কর্মচারী নুরুল হক মোল্লাসহ অর্ধশত আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

২০ পুলিশ কর্মকর্তার অনুসন্ধানে ঢিমেতাল

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশের উচ্চপদস্থ ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দুদকের হাতে রয়েছে। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো, পেশিশক্তি প্রদর্শন, মানি লন্ডারিং, অর্থ পাচার, দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), খুলনা, যশোর, বগুড়া জেলা পলিশ সুপার, সিআইডি, পিবিআই, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ হাসপাতাল, শিল্পাঞ্চল পুলিশসহ অন্যান্য শাখার ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত দুই থেকে পাঁচ বছর ধরেই চলছে অনুসন্ধান। ফাইলগুলো বাঁধা রয়েছে লাল ফিতায়। ২০ কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৫ জন, বাকি ৫ জন সাবেক।

কর্মরতদের মধ্যে র‍্যাব-২ ঢাকার তেজগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রমোটি) উত্তম কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাড অ্যান্ড ফিন্যান্স) এম এ মাসুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে ২১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডির পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বৈধ করার জন্য সাউদার্ন পার্ক সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি খোলার অভিযোগ, সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী নিশাতের বিরুদ্ধে ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ আড়াল করতে সম্পত্তি ক্রয়সহ মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ, রাজশাহী সারদার পুলিশ একাডেমির অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক হামিদুল আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

খুলনার খালিশপুর পুলিশ লাইনসের আরআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৬ এর পরিদর্শক আবুল বাশারের বিরুদ্ধে বেআইনি ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে ও পেশিশক্তি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদের বিরুদ্ধে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ আয়ের উৎস আড়াল করাসহ মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন, কুমিল্লা অঞ্চলের সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুতুব উদ্দিনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ঢাকার আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক জাবেদ মাসুদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, রাজশাহী পিবিআইর পুলিশ পরিদর্শক ফরিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ঢাকার পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার, নিজ ও স্ত্রীর নামে দেশে-বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

যশোর জেলা পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণসহ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অতিরিক্ত আইজিপি হেমায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে টঙ্গী, গাজীপুরে দুটি প্লট, ৩০০ ফিটে পুলিশ প্রকল্পে একটি প্লট, সাভার পুলিশ হাউজিংয়ে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট, জোয়ার সাহারা পুলিশ প্রকল্পে প্লট, ঢাকার উত্তরায় ফ্ল্যাট ও প্লট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছয় তলা বাড়ি, গোপালগঞ্জে পেট্রোল পাম্প, স্কুল, কলেজ, বাড়িসহ অন্যান্য অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ পরিদর্শক ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে ১০টি ব্যাংকসহ বিকাশ ও নগদের ১৬টি হিসাবে ২০০২ সাল থেকে ৯১ কোটি ৮২ লাখ টাকার লেনদেন, সরকারি চাকরিজীবী হয়ে নিজেকে চারটি প্রতিষ্ঠানের মালিক দেখিয়ে অবৈধ আয়ের উৎস্য গোপন করে ভাই আজিজুল হকের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থ আদান-প্রদান পূর্বক অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এবং সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

পুলিশের সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নাজমুল হাসান ফিরোজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আবদুল হক খান ও তাঁর মেয়ে সাদিয়া আফরোজের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে পুলিশ বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার, এনকাউন্টারের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বগুড়া জেলার সাবেক পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক এবং খুলনা বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালের সাবেক ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে দুদক কমিশনার জহুরুল হক সমকালকে বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা উচিত। এ ব্যাপারে কমিশন চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, কমিশনের কার্যকর ভূমিকার কারণেই অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ আগের চেয়ে দ্রুত হচ্ছে। পুলিশের ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধীরগতির অনুসন্ধানের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান জহুরুল হক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা এক বিষয় আর দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম বাস্তবায়নে পরিবেশ সৃষ্টি করা আরেক বিষয়। ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের ওপর হাত দেওয়া কঠিন– এমন ধারণা পোষণ করে দুদক। এ জন্য আলোচনায় আসা ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের আওতায় এনে লম্ফজম্প করে তারা। তিনি বলেন, দুদক ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছিদের আইনের আওতায় আনতে পেরেছে বা পারবে– এ বিষয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম।