ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করবে তৃতীয়পক্ষ, ১০ কর্মদিবসের মধ্যে নীতিমালা

প্রকাশিত: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২৪

আফরিন আক্তারঃ 

দেশের বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সব কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে, এটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর পর যথারীতি নড়চেড়ে বসেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এরই অংশ হিসেবে সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে একটি নীতিমালা তৈরি এবং এতে বুয়েটসহ বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে তৃতীয়পক্ষকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে রাজউক ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নগর উন্নয়ন কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানেই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হতে পারে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ভবনের ত্রুটি বা ঝুঁকি চিহ্নিত করতে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়। আগামী দশ কর্মদিবসের মধ্যে নীতিমালা চূড়ান্ত হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর যতো ভবন আছে, সব পরীক্ষা করা হবে। কোনো ভবন ভেঙে ফেলা হবে কী না সেটি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর আলোকে অবৈধ ভবন বৈধকরণ পদ্ধতিও চূড়ান্ত করা হবে। কমিটি প্রস্তাব করেছে, নির্ধারিত ফির ৫ গুণ জরিমানা দিয়ে অবৈধ ভবন বৈধকরণ করা হবে। তবে এটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় চূড়ান্ত হবে।
ঝুঁকি যাচাই-বাছাই কমিটিতে রাখা হবে সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞদের। সেখানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রতিনিধি, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) প্রতিনিধি, রাজউকের টেকনিক্যাল প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে হবে তৃতীয় পক্ষ।

জাতীয় নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নীতিমালা হলে ঢাকা শহরের অবৈধ ভবনগুলো একটা কাঠামোতে চলে আসবে। অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে রাজউকের অভিযানের জন্য একটা গাইড লাইন তৈরি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযানে যাওয়ার পর ভবনটি কীসের ভিত্তিতে অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ, অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যত্যয় চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো লিখিত থাকতে হবে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভূমিকম্প সহনশীলতা প্রকল্প (আরবান রেজিলিয়েন্স)-এর আওতায় ২ হাজার ৭০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২০৭টি হাসপাতাল, ৩৬টি থানা ও ৩০৪টি অন্যান্য ভবনের জরিপ চালানো হয়। এসব ভবনের মধ্যে ৫৭৯টির ‘প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট’ (পিইএ) করা হয়। এতে ৪২টি ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ১৮৭টি ভবনকে ‘ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট’ করে সেগুলো মজবুত (রেক্টিফাই) করতে প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ভবন অপসারণে কয়েক বার চিঠি দিলেও কর্ণপাত করছে না কেউ।

৪২টি ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মৌচাক মার্কেট ছিল। সেই মার্কেটে হাইকোর্ট থেকে ৬ মাসের স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়। হাইকোর্টের সেই নির্দেশনায় রয়েছে জনসাধারণ নিজ নিজ বিবেচনায় সাবধানতা অবলম্বন করে ভবনে প্রবেশ করবে। হাইকোর্টের এ নির্দেশনাটি যেন মার্কেটের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয় সেটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্ণয়ের কাজ ও জাতীয় নগর উন্নয়ন কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে তা জানতে চাইলে রাজউকের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল আহাদ ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্ণয়ের কাজ রাজউক আগে থেকে করে আসছে। জাতীয় নগর উন্নয়ন কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ করা হবে। তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ হয়ে গেলে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করবে, সেগুলো আমরা সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক বা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেব। তা ছাড়া নতুন নির্মিত ভবনে অকুপেন্সি সনদ ছাড়া সেবা সংস্থার সংযোগ না দিতে সংস্থাগুলোকে চিঠি দেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, এ মুহূর্তে রাজধানীর কতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তার সঠিক তালিকা নেই রাজধানীকে দেখভাল করা উত্তর সিটি করপোরেশন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে।
তবে ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকাসহ দেশের আট বিভাগে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ৩৭৬ বহুতল, শিল্পকারখানা, মার্কেট-শপিংমল, সরকারি ও অন্যান্য ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অতি অগ্নি ঝুঁকিতে থাকা ভবনের সংখ্যা পাওয়া গেছে ৪২৪টি, এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ১ হাজার ৬৯৪টি।